ফিচার

সামাজিক মাধ্যম, নাকি অ-সামাজিক মাধ্যম?


নিউজরুম ডেস্ক
রবিবার, ৮ মার্চ ২০২০ ইং ০৬:৫৯
NewsRoom


নিজের নিরাপত্তার খাতিরে প্রথমেই বলে নিতে চাই, আমি সামাজিক মাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়ার বিরোধী নই; সামাজিক মাধ্যমকে আমি খারাপ বস্তু ভাবি না। আমার এই লেখার উদ্দেশ্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করা নয়। তবে এই মাধ্যমের যে অপব্যবহার হচ্ছে, ভুল ব্যবহার হচ্ছে এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার হচ্ছে, সেদিকে সবার দৃষ্টি ফেরানো জরুরি বলে মনে করি।

সুইডিশ রসায়নবিদ ও প্রকৌশলী আলফ্রেড নোবেল ডিনামাইট উদ্ভাবন করেন যার পেটেন্ট বা কৃতিস্বত্ব পান ১৮৬৭ সালে। ডিনামাইট তৈরির ফলে পাহাড় খনন, খনির কাজ, বাঁধের কাজ এবং বড় স্থাপনা ধ্বংস করে পুনর্নির্মাণের কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়। এ সময় ডিনামাইট উদ্ভাবনকে বিজ্ঞানের ‘আশির্বাদ’ হিসেবে দেখা শুরু হয়। এর অল্প সময়ের মধ্যেই ডিনামাইটের প্রযুক্তি ও উপকরণ সহজলভ্য হতে শুরু করলে যুদ্ধ অর্থাৎ নির্বিচারে মানুষ হত্যার মতো আরো অনেক ধ্বংসাত্মক কাজে এর ব্যবহার ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। মানুষ তখন ডিনামাইটকে মানবজাতির জন্যে ‘অভিশাপ’ হিসেবে দেখতে শুরু করে।

এর পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরেই বিতর্ক চলেছে : ডিনামাইট আশির্বাদ, নাকি অভিশাপ?

এই বিতর্কের মিমাংসা হয়নি। এ ধরনের প্রযুক্তির পক্ষে ও বিপক্ষে - দুদিকেই যুক্তি রয়েছে, জনমত রয়েছে। তবে এর মধ্যে একটি বাস্তবতা রয়েছে যা অনেকের নজর এড়িয়ে যায় : ডিনামাইট নিজে ভালো বা মন্দ নয়; কীভাবে বা কী কারণে ব্যবহৃত হচ্ছে - এর মাধ্যমে সে ভালো বা মন্দ হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

আমার নিজের প্রত্যক্ষ করা কয়েকটি ঘটনা দিয়ে ব্যাখ্যা করছি :

কেস স্টাডি-এক :

রেস্টুরেন্টে খেতে আসা ৬ বন্ধুর ৪ জনের হাতে ফোন। ৪ জনই ফেসবুকে ব্যস্ত। ফেসবুকে অন্য বন্ধুদের সাথে সাথে ওই ৪ জন নিজেদের মধ্যেও যোগাযোগ চালাচ্ছেন। একটু পর পর ওই ৪ জন একে অন্যকে তার ‘কমেন্ট’ পড়তে বলছেন। অন্যরা ফেসবুকে তার কমেন্ট পড়ে লাইক বা প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। অন্য ২ জনও নিজেদের মধ্যে কদাচিৎ কথা বলছেন; ২ জনই নিজ নিজ ফোন থেকে একের পর এক নম্বরে ডায়াল করে কথা বলে যাচ্ছেন।

কেস স্টাডি-দুই :

৩ বন্ধু মিলে একটি রেস্টুরেন্টে খেতে বসেছেন। তাদের টেবিলের পাশের দেয়ালে টিভিতে চলছে ২০১৯ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপের বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ। কিন্তু টিভিতে খেলা না দেখে ৩ জনের প্রত্যেকেই নিজেদের স্মার্টফোনে খেলার স্কোর দেখছেন।

কেস স্টাডি-তিন :

একটি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান। ওই প্রতিষ্ঠানের একটি অংশের জন্যে নির্দিষ্ট অফিস রুমে প্রায় ৮ জনের বসার ব্যবস্থা। ঘণ্টা দুয়েক সেখানে অবস্থান করে বোঝা গেল, ওই কক্ষের ৫/৬ জন সহকর্মী নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করছেন ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপসহ এ ধরনের অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে। জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হওয়া গেলো, এটি তাদের ওইদিনের বিশেষ আচরণ নয়, প্রতিদিনের চর্চা।

কেস স্টাডি-চার, পাঁচ, ছয়... :

একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এমনকি সবাই ঘরে থাকা অবস্থাতেও কতোটা যোগাযোগ হয়? এক ঘর থেকে অন্য ঘরের সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগ হয় ফেসবুকে, নয়তো হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, মেসেঞ্জার ইত্যাদির মাধ্যমে। ঘরের বাইরে থাকলে সামাজিক মাধ্যমসহ এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে যোগাযোগের চর্চা রীতিমতো প্রবণতা হয়ে উঠেছে; ঘরে ফিরেও প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া নিজেদের মধ্যে সরাসরি কথা বলার চর্চা শূন্য হয়ে যাচ্ছে। এভাবে দৈহিক বা শারীরিক কিংবা ভৌগোলিক দূরত্ব তেমন না থাকলেও মানসিক দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছে। অন্য ব্যক্তিটি যে নিজের খুব কাছাকাছিই অবস্থান করছে এবং তার সঙ্গে মুখোমুখি বসেই কথা বলা সম্ভব - মানুষের ভাবনার জগত থেকে এটি হারিয়ে যাচ্ছে।

সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে কোনো বাধা নেই; হাজারো মাইল দূরে থাকা বন্ধুর সঙ্গে সবসময় এবং সহজেই যোগাযোগের জন্যে এর চেয়ে ভালো উপায় আর হতে পারে না। সামাজিক নানা ইস্যুতে জনকল্যাণে জনমত গড়ে তোলার জন্যেও এটি সবচেয়ে সহজ প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু গাঁ ঘেঁষে বসার পরও একজন অন্যজনের মুখের দিকে না তাকিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেসবুকে সময় কাটিয়ে দেয়া বা এ ধরনের অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ চালিয়ে যাওয়া - এটি কী করে সামাজিকতার উদাহরণ হয়?

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের মাধ্যমে সমাজে বসবাসরত মানুষের মধ্যে সহজে যোগাযোগ রক্ষার কাজে বেশ সুবিধা হয়েছে। কিন্তু এর উদ্দেশ্য কখনোই মুখোমুখি যোগাযোগকে বাতিল ঘোষণা করা নয়। যোগাযোগ শাস্ত্র সম্বন্ধে যাদের পড়াশোনা আছে, তারা জানেন, ফেস-টু-ফেস যোগাযোগ বা সামনাসামনি বসে কথা বলা যোগাযোগের সবচেয়ে আদর্শ ধরন। বিভিন্ন গবেষণা বলে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে মানুষ সবসময় সত্য কথা বলে না, নিজের ভালো-মন্দ সব দিক তুলে ধরে না; সেখানে মানুষ বেশ সিলেকটিভ। ফলে কেবল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমনির্ভর যোগাযোগ আসলে প্রতিটি মানুষকে এক অর্থে অন্যদের ব্যাপারে প্রতারিত করছে। একজন মানুষের ২০০ জন বা ৫০০ জন বা কয়েক হাজার ‘বন্ধু’ হতে পারে না। ‘ফলোয়ার’ মাত্রই ‘ফ্যান’ - এর নিশ্চয়তা কী?

কোনো মানুষ দেখতে তার প্রতিষ্ঠানের আইডি বা এনআইডি কার্ডের ছবির মতো কুৎসিত নয় এবং তার ফেসবুক আইডির প্রোফাইল পিকচার বা ডিসপ্লে ফটোর মতো চমৎকারও নয়; প্রতিটি ব্যক্তি, সব দিক থেকে, আসলে ওই দুই ছবির মধ্যবর্তী সত্ত্বা। আর সেই সত্ত্বার সন্ধান কেবল সামাজিক পরিম-লে সনাতনী যোগাযোগের মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জনকল্যাণে অকল্পনীয় ভূমিকা রেখেছে - এমন উদাহরণ বিশ্বজুড়ে অগুণতি রয়েছে। তাই এসব মাধ্যমকে খারাপ বলার বা দোষারোপের সুযোগ নেই। দেখা দরকার, মানুষ এদেরকে কীভাবে বা কী কাজে ব্যবহার করছে। নিশ্চয়ই এসব মাধ্যম যোগাযোগকে সহজ ও সুবিধাজনক করার মাধ্যমে আমাদের জীবনযাত্রাকে সহজতর করেছে; কিন্তু মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ও নির্বিচারে সোশ্যাল মিডিয়ানির্ভর হতে পারে না। ভৌগোলিক দূরত্ব বা অনিবার্য কারণে সশরীরে অনুপস্থিত ‘বন্ধু’র সাথে যোগাযোগের জন্যে সামাজিক মাধ্যম অপরিহার্য হতে পারে; কিন্তু কেবল এমন সহজলভ্য মাধ্যম আছে বলে ‘বন্ধু’র সশরীর উপস্থিতিকে অপ্রয়োজনীয় করে তোলা সামাজিক বা যোগাযোগ - কোনোটিই নয়।

আর ফেসবুকের মতো সামাজিক মাধ্যমগুলো যে ব্যবহারকারীদের প্রচ-ভাবে আত্মকেন্দ্রিক ও আত্মপ্রেমী (নার্সিসিস্ট) করে তুলছে, সেদিকেও সতর্ক থাকা দরকার। নিজের একটি পোস্টে লাইক না পড়লে বা শেয়ার না হলে ব্যক্তির মনের শান্তি নষ্ট হয়; তাই বলে-কয়ে এমনকি হুমকি-ধমকি দিয়েও অনেককে লাইক ও শেয়ার আদায় করে নিতে দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ‘বন্ধু’র মন রক্ষার্থে বা পরে নিজেও লাইক ও শেয়ার পাওয়ার আশায় মানুষ অনেক সময় ভালো করে না পড়ে বা না দেখেই পরিচিত জনদের পোস্টে লাইক বা শেয়ার দিয়ে দেয়; এর ঝুঁকি কতোখানি, সেটি ভেবে দেখা দরকার নয় কি? ঘরের ভেতরের পাশের কক্ষের মানুষটিও ‘বন্ধু’, আবার হাজার মাইল দূরের একেবারে না চেনা, না জানা ব্যক্তিটিও যখন অনলাইনে ‘বন্ধু’ হয়, তার ইতিবাচক উপযোগের পাশাপাশি ক্ষতির ঝুঁকিও যে সমানভাবে অসীম, তা কি সবসময় ভেবে দেখা হয়?

আমার চেনা-জানা বা কাছের মানুষদের কেউ কেউ প্রায়ই আমাকে ফেসবুকে আইডি খুলতে বলেন। আমার উত্তর হলো, আমি কখনো ফেসবুক ব্যবহার করার প্রয়োজন অনুভব করিনি। যাদের সাথে আমার সত্যিই যোগাযোগ রক্ষার দরকার, তাদের সাথে ফোনে বা সরাসরি আমার যোগাযোগ রয়েছে; অনেকের সঙ্গে বাসায় বা অফিসে বা অন্য কোথাও প্রায়ই সরাসরি দেখা-সাক্ষাত হচ্ছে। তাহলে আমাকে কেন তাদের সঙ্গে ফেসবুকে যোগাযোগ করতে হবে? এই উত্তরে কেউ আবার বলেন, ফেসবুকে থাকলে আমার আরো অনেকের সাথে পরিচয় হতো, ‘বন্ধুত্ব’ হতো। কিন্তু আমার কথা হলো, যদি তারা আমার জীবনে দরকারি হতো কিংবা আমি যদি তাদের জীবনে দরকারি হতাম, তাহলে ফেসবুক ছাড়াই অন্য যে-কোনো উপায়ে হলেও তাদের সাথে আমার পরিচয় বা বন্ধুত্ব হতো কিংবা হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, ফেসবুক বা এ ধরনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সঠিক বা কার্যকর ব্যবহার সম্বন্ধে আমার জ্ঞান বা ব্যবহারের আগ্রহ এখনো শুন্যের পর্যায়ে আছে; যদি কখনো এ বিষয়ে আমার জ্ঞানলাভ হয় বা এই মাধ্যম ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা বোধ করি, তাহলে হয়তো ব্যবহার করবো।

শেষ কথা হলো, সামাজিক যোগাযোগের ওপর অপ্রয়োজনীয় ও অতি-নির্ভরতা মানুষের সামাজিক ও মানবিক গুণাবলিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, সামাজিক মূলধন (সোশ্যাল ক্যাপিটাল) অপচয় করে। সামাজিক মাধ্যমে যোগাযোগ দরকার নাকি যোগাযোগ দরকার, আগে তা ভেবে নেয়া দরকার। যেখানে অপরিহার্য, সেখানে ব্যবহার করতে দোষ নেই; কিন্তু যেখানে সামনাসামনি যোগাযোগের প্রয়োজন ও সুযোগ - দুটোই রয়েছে, সেখানেও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের প্রবণতা ভালো কথা নয়।

তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নির্বিচার ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেকে বরং ‘অ-সামাজিক’ করে তোলা হচ্ছে কি না, সেটি বিবেচনায় রাখা দরকার। আর ‘বন্ধু’ নির্বাচন এবং যোগাযোগের নানা ক্ষেত্রে আরো বেশি সিলেকটিভ হওয়া দরকার। বিবেচনাহীন ব্যবহারের ফলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যদি মানুষের জীবনের ‘কোয়ালিটি টাইম’ নষ্ট করে, মানুষের মধ্যে মানসিক দূরত্ব বাড়ায়, তবে প্রযুক্তির এই উৎকর্ষের যুগে এর চেয়ে দুর্ভাগ্যের কথা আর কী হতে পারে!

তাই, সামাজিক মাধ্যম - যে মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, নাকি অ-সামাজিক মাধ্যম - যা মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করবে - আমাদেরকেই ঠিক করে নিতে হবে আমরা কী চাই।

 

সজীব সরকার, 
সহকারি অধ্যাপক; জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ;
স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। লেখক ও গবেষক।

আপনার মতামত লিখুন :

ডেটায় দেশ

ফিচার

সামাজিক মাধ্যম, নাকি অ-সামাজিক মাধ্যম?


নিউজরুম ডেস্ক
রবিবার, ৮ মার্চ ২০২০ ইং ০৬:৫৯
NewsRoom


নিজের নিরাপত্তার খাতিরে প্রথমেই বলে নিতে চাই, আমি সামাজিক মাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়ার বিরোধী নই; সামাজিক মাধ্যমকে আমি খারাপ বস্তু ভাবি না। আমার এই লেখার উদ্দেশ্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করা নয়। তবে এই মাধ্যমের যে অপব্যবহার হচ্ছে, ভুল ব্যবহার হচ্ছে এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার হচ্ছে, সেদিকে সবার দৃষ্টি ফেরানো জরুরি বলে মনে করি।

সুইডিশ রসায়নবিদ ও প্রকৌশলী আলফ্রেড নোবেল ডিনামাইট উদ্ভাবন করেন যার পেটেন্ট বা কৃতিস্বত্ব পান ১৮৬৭ সালে। ডিনামাইট তৈরির ফলে পাহাড় খনন, খনির কাজ, বাঁধের কাজ এবং বড় স্থাপনা ধ্বংস করে পুনর্নির্মাণের কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়। এ সময় ডিনামাইট উদ্ভাবনকে বিজ্ঞানের ‘আশির্বাদ’ হিসেবে দেখা শুরু হয়। এর অল্প সময়ের মধ্যেই ডিনামাইটের প্রযুক্তি ও উপকরণ সহজলভ্য হতে শুরু করলে যুদ্ধ অর্থাৎ নির্বিচারে মানুষ হত্যার মতো আরো অনেক ধ্বংসাত্মক কাজে এর ব্যবহার ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। মানুষ তখন ডিনামাইটকে মানবজাতির জন্যে ‘অভিশাপ’ হিসেবে দেখতে শুরু করে।

এর পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরেই বিতর্ক চলেছে : ডিনামাইট আশির্বাদ, নাকি অভিশাপ?

এই বিতর্কের মিমাংসা হয়নি। এ ধরনের প্রযুক্তির পক্ষে ও বিপক্ষে - দুদিকেই যুক্তি রয়েছে, জনমত রয়েছে। তবে এর মধ্যে একটি বাস্তবতা রয়েছে যা অনেকের নজর এড়িয়ে যায় : ডিনামাইট নিজে ভালো বা মন্দ নয়; কীভাবে বা কী কারণে ব্যবহৃত হচ্ছে - এর মাধ্যমে সে ভালো বা মন্দ হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

আমার নিজের প্রত্যক্ষ করা কয়েকটি ঘটনা দিয়ে ব্যাখ্যা করছি :

কেস স্টাডি-এক :

রেস্টুরেন্টে খেতে আসা ৬ বন্ধুর ৪ জনের হাতে ফোন। ৪ জনই ফেসবুকে ব্যস্ত। ফেসবুকে অন্য বন্ধুদের সাথে সাথে ওই ৪ জন নিজেদের মধ্যেও যোগাযোগ চালাচ্ছেন। একটু পর পর ওই ৪ জন একে অন্যকে তার ‘কমেন্ট’ পড়তে বলছেন। অন্যরা ফেসবুকে তার কমেন্ট পড়ে লাইক বা প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। অন্য ২ জনও নিজেদের মধ্যে কদাচিৎ কথা বলছেন; ২ জনই নিজ নিজ ফোন থেকে একের পর এক নম্বরে ডায়াল করে কথা বলে যাচ্ছেন।

কেস স্টাডি-দুই :

৩ বন্ধু মিলে একটি রেস্টুরেন্টে খেতে বসেছেন। তাদের টেবিলের পাশের দেয়ালে টিভিতে চলছে ২০১৯ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপের বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ। কিন্তু টিভিতে খেলা না দেখে ৩ জনের প্রত্যেকেই নিজেদের স্মার্টফোনে খেলার স্কোর দেখছেন।

কেস স্টাডি-তিন :

একটি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান। ওই প্রতিষ্ঠানের একটি অংশের জন্যে নির্দিষ্ট অফিস রুমে প্রায় ৮ জনের বসার ব্যবস্থা। ঘণ্টা দুয়েক সেখানে অবস্থান করে বোঝা গেল, ওই কক্ষের ৫/৬ জন সহকর্মী নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করছেন ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপসহ এ ধরনের অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে। জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হওয়া গেলো, এটি তাদের ওইদিনের বিশেষ আচরণ নয়, প্রতিদিনের চর্চা।

কেস স্টাডি-চার, পাঁচ, ছয়... :

একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এমনকি সবাই ঘরে থাকা অবস্থাতেও কতোটা যোগাযোগ হয়? এক ঘর থেকে অন্য ঘরের সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগ হয় ফেসবুকে, নয়তো হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, মেসেঞ্জার ইত্যাদির মাধ্যমে। ঘরের বাইরে থাকলে সামাজিক মাধ্যমসহ এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে যোগাযোগের চর্চা রীতিমতো প্রবণতা হয়ে উঠেছে; ঘরে ফিরেও প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া নিজেদের মধ্যে সরাসরি কথা বলার চর্চা শূন্য হয়ে যাচ্ছে। এভাবে দৈহিক বা শারীরিক কিংবা ভৌগোলিক দূরত্ব তেমন না থাকলেও মানসিক দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছে। অন্য ব্যক্তিটি যে নিজের খুব কাছাকাছিই অবস্থান করছে এবং তার সঙ্গে মুখোমুখি বসেই কথা বলা সম্ভব - মানুষের ভাবনার জগত থেকে এটি হারিয়ে যাচ্ছে।

সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে কোনো বাধা নেই; হাজারো মাইল দূরে থাকা বন্ধুর সঙ্গে সবসময় এবং সহজেই যোগাযোগের জন্যে এর চেয়ে ভালো উপায় আর হতে পারে না। সামাজিক নানা ইস্যুতে জনকল্যাণে জনমত গড়ে তোলার জন্যেও এটি সবচেয়ে সহজ প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু গাঁ ঘেঁষে বসার পরও একজন অন্যজনের মুখের দিকে না তাকিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেসবুকে সময় কাটিয়ে দেয়া বা এ ধরনের অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ চালিয়ে যাওয়া - এটি কী করে সামাজিকতার উদাহরণ হয়?

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের মাধ্যমে সমাজে বসবাসরত মানুষের মধ্যে সহজে যোগাযোগ রক্ষার কাজে বেশ সুবিধা হয়েছে। কিন্তু এর উদ্দেশ্য কখনোই মুখোমুখি যোগাযোগকে বাতিল ঘোষণা করা নয়। যোগাযোগ শাস্ত্র সম্বন্ধে যাদের পড়াশোনা আছে, তারা জানেন, ফেস-টু-ফেস যোগাযোগ বা সামনাসামনি বসে কথা বলা যোগাযোগের সবচেয়ে আদর্শ ধরন। বিভিন্ন গবেষণা বলে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে মানুষ সবসময় সত্য কথা বলে না, নিজের ভালো-মন্দ সব দিক তুলে ধরে না; সেখানে মানুষ বেশ সিলেকটিভ। ফলে কেবল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমনির্ভর যোগাযোগ আসলে প্রতিটি মানুষকে এক অর্থে অন্যদের ব্যাপারে প্রতারিত করছে। একজন মানুষের ২০০ জন বা ৫০০ জন বা কয়েক হাজার ‘বন্ধু’ হতে পারে না। ‘ফলোয়ার’ মাত্রই ‘ফ্যান’ - এর নিশ্চয়তা কী?

কোনো মানুষ দেখতে তার প্রতিষ্ঠানের আইডি বা এনআইডি কার্ডের ছবির মতো কুৎসিত নয় এবং তার ফেসবুক আইডির প্রোফাইল পিকচার বা ডিসপ্লে ফটোর মতো চমৎকারও নয়; প্রতিটি ব্যক্তি, সব দিক থেকে, আসলে ওই দুই ছবির মধ্যবর্তী সত্ত্বা। আর সেই সত্ত্বার সন্ধান কেবল সামাজিক পরিম-লে সনাতনী যোগাযোগের মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জনকল্যাণে অকল্পনীয় ভূমিকা রেখেছে - এমন উদাহরণ বিশ্বজুড়ে অগুণতি রয়েছে। তাই এসব মাধ্যমকে খারাপ বলার বা দোষারোপের সুযোগ নেই। দেখা দরকার, মানুষ এদেরকে কীভাবে বা কী কাজে ব্যবহার করছে। নিশ্চয়ই এসব মাধ্যম যোগাযোগকে সহজ ও সুবিধাজনক করার মাধ্যমে আমাদের জীবনযাত্রাকে সহজতর করেছে; কিন্তু মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ও নির্বিচারে সোশ্যাল মিডিয়ানির্ভর হতে পারে না। ভৌগোলিক দূরত্ব বা অনিবার্য কারণে সশরীরে অনুপস্থিত ‘বন্ধু’র সাথে যোগাযোগের জন্যে সামাজিক মাধ্যম অপরিহার্য হতে পারে; কিন্তু কেবল এমন সহজলভ্য মাধ্যম আছে বলে ‘বন্ধু’র সশরীর উপস্থিতিকে অপ্রয়োজনীয় করে তোলা সামাজিক বা যোগাযোগ - কোনোটিই নয়।

আর ফেসবুকের মতো সামাজিক মাধ্যমগুলো যে ব্যবহারকারীদের প্রচ-ভাবে আত্মকেন্দ্রিক ও আত্মপ্রেমী (নার্সিসিস্ট) করে তুলছে, সেদিকেও সতর্ক থাকা দরকার। নিজের একটি পোস্টে লাইক না পড়লে বা শেয়ার না হলে ব্যক্তির মনের শান্তি নষ্ট হয়; তাই বলে-কয়ে এমনকি হুমকি-ধমকি দিয়েও অনেককে লাইক ও শেয়ার আদায় করে নিতে দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ‘বন্ধু’র মন রক্ষার্থে বা পরে নিজেও লাইক ও শেয়ার পাওয়ার আশায় মানুষ অনেক সময় ভালো করে না পড়ে বা না দেখেই পরিচিত জনদের পোস্টে লাইক বা শেয়ার দিয়ে দেয়; এর ঝুঁকি কতোখানি, সেটি ভেবে দেখা দরকার নয় কি? ঘরের ভেতরের পাশের কক্ষের মানুষটিও ‘বন্ধু’, আবার হাজার মাইল দূরের একেবারে না চেনা, না জানা ব্যক্তিটিও যখন অনলাইনে ‘বন্ধু’ হয়, তার ইতিবাচক উপযোগের পাশাপাশি ক্ষতির ঝুঁকিও যে সমানভাবে অসীম, তা কি সবসময় ভেবে দেখা হয়?

আমার চেনা-জানা বা কাছের মানুষদের কেউ কেউ প্রায়ই আমাকে ফেসবুকে আইডি খুলতে বলেন। আমার উত্তর হলো, আমি কখনো ফেসবুক ব্যবহার করার প্রয়োজন অনুভব করিনি। যাদের সাথে আমার সত্যিই যোগাযোগ রক্ষার দরকার, তাদের সাথে ফোনে বা সরাসরি আমার যোগাযোগ রয়েছে; অনেকের সঙ্গে বাসায় বা অফিসে বা অন্য কোথাও প্রায়ই সরাসরি দেখা-সাক্ষাত হচ্ছে। তাহলে আমাকে কেন তাদের সঙ্গে ফেসবুকে যোগাযোগ করতে হবে? এই উত্তরে কেউ আবার বলেন, ফেসবুকে থাকলে আমার আরো অনেকের সাথে পরিচয় হতো, ‘বন্ধুত্ব’ হতো। কিন্তু আমার কথা হলো, যদি তারা আমার জীবনে দরকারি হতো কিংবা আমি যদি তাদের জীবনে দরকারি হতাম, তাহলে ফেসবুক ছাড়াই অন্য যে-কোনো উপায়ে হলেও তাদের সাথে আমার পরিচয় বা বন্ধুত্ব হতো কিংবা হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, ফেসবুক বা এ ধরনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সঠিক বা কার্যকর ব্যবহার সম্বন্ধে আমার জ্ঞান বা ব্যবহারের আগ্রহ এখনো শুন্যের পর্যায়ে আছে; যদি কখনো এ বিষয়ে আমার জ্ঞানলাভ হয় বা এই মাধ্যম ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা বোধ করি, তাহলে হয়তো ব্যবহার করবো।

শেষ কথা হলো, সামাজিক যোগাযোগের ওপর অপ্রয়োজনীয় ও অতি-নির্ভরতা মানুষের সামাজিক ও মানবিক গুণাবলিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, সামাজিক মূলধন (সোশ্যাল ক্যাপিটাল) অপচয় করে। সামাজিক মাধ্যমে যোগাযোগ দরকার নাকি যোগাযোগ দরকার, আগে তা ভেবে নেয়া দরকার। যেখানে অপরিহার্য, সেখানে ব্যবহার করতে দোষ নেই; কিন্তু যেখানে সামনাসামনি যোগাযোগের প্রয়োজন ও সুযোগ - দুটোই রয়েছে, সেখানেও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের প্রবণতা ভালো কথা নয়।

তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নির্বিচার ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেকে বরং ‘অ-সামাজিক’ করে তোলা হচ্ছে কি না, সেটি বিবেচনায় রাখা দরকার। আর ‘বন্ধু’ নির্বাচন এবং যোগাযোগের নানা ক্ষেত্রে আরো বেশি সিলেকটিভ হওয়া দরকার। বিবেচনাহীন ব্যবহারের ফলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যদি মানুষের জীবনের ‘কোয়ালিটি টাইম’ নষ্ট করে, মানুষের মধ্যে মানসিক দূরত্ব বাড়ায়, তবে প্রযুক্তির এই উৎকর্ষের যুগে এর চেয়ে দুর্ভাগ্যের কথা আর কী হতে পারে!

তাই, সামাজিক মাধ্যম - যে মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, নাকি অ-সামাজিক মাধ্যম - যা মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করবে - আমাদেরকেই ঠিক করে নিতে হবে আমরা কী চাই।

 

সজীব সরকার, 
সহকারি অধ্যাপক; জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ;
স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। লেখক ও গবেষক।

আপনার মতামত লিখুন :


সামাজিক মাধ্যম, নাকি অ-সামাজিক মাধ্যম?

নিউজরুম ডেস্ক রবিবার, ৮ মার্চ ২০২০ ইং ০৬:৫৯ NewsRoom


নিজের নিরাপত্তার খাতিরে প্রথমেই বলে নিতে চাই, আমি সামাজিক মাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়ার বিরোধী নই; সামাজিক মাধ্যমকে আমি খারাপ বস্তু ভাবি না। আমার এই লেখার উদ্দেশ্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করা নয়। তবে এই মাধ্যমের যে অপব্যবহার হচ্ছে, ভুল ব্যবহার হচ্ছে এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার হচ্ছে, সেদিকে সবার দৃষ্টি ফেরানো জরুরি বলে মনে করি।

সুইডিশ রসায়নবিদ ও প্রকৌশলী আলফ্রেড নোবেল ডিনামাইট উদ্ভাবন করেন যার পেটেন্ট বা কৃতিস্বত্ব পান ১৮৬৭ সালে। ডিনামাইট তৈরির ফলে পাহাড় খনন, খনির কাজ, বাঁধের কাজ এবং বড় স্থাপনা ধ্বংস করে পুনর্নির্মাণের কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়। এ সময় ডিনামাইট উদ্ভাবনকে বিজ্ঞানের ‘আশির্বাদ’ হিসেবে দেখা শুরু হয়। এর অল্প সময়ের মধ্যেই ডিনামাইটের প্রযুক্তি ও উপকরণ সহজলভ্য হতে শুরু করলে যুদ্ধ অর্থাৎ নির্বিচারে মানুষ হত্যার মতো আরো অনেক ধ্বংসাত্মক কাজে এর ব্যবহার ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। মানুষ তখন ডিনামাইটকে মানবজাতির জন্যে ‘অভিশাপ’ হিসেবে দেখতে শুরু করে।

এর পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরেই বিতর্ক চলেছে : ডিনামাইট আশির্বাদ, নাকি অভিশাপ?

এই বিতর্কের মিমাংসা হয়নি। এ ধরনের প্রযুক্তির পক্ষে ও বিপক্ষে - দুদিকেই যুক্তি রয়েছে, জনমত রয়েছে। তবে এর মধ্যে একটি বাস্তবতা রয়েছে যা অনেকের নজর এড়িয়ে যায় : ডিনামাইট নিজে ভালো বা মন্দ নয়; কীভাবে বা কী কারণে ব্যবহৃত হচ্ছে - এর মাধ্যমে সে ভালো বা মন্দ হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

আমার নিজের প্রত্যক্ষ করা কয়েকটি ঘটনা দিয়ে ব্যাখ্যা করছি :

কেস স্টাডি-এক :

রেস্টুরেন্টে খেতে আসা ৬ বন্ধুর ৪ জনের হাতে ফোন। ৪ জনই ফেসবুকে ব্যস্ত। ফেসবুকে অন্য বন্ধুদের সাথে সাথে ওই ৪ জন নিজেদের মধ্যেও যোগাযোগ চালাচ্ছেন। একটু পর পর ওই ৪ জন একে অন্যকে তার ‘কমেন্ট’ পড়তে বলছেন। অন্যরা ফেসবুকে তার কমেন্ট পড়ে লাইক বা প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। অন্য ২ জনও নিজেদের মধ্যে কদাচিৎ কথা বলছেন; ২ জনই নিজ নিজ ফোন থেকে একের পর এক নম্বরে ডায়াল করে কথা বলে যাচ্ছেন।

কেস স্টাডি-দুই :

৩ বন্ধু মিলে একটি রেস্টুরেন্টে খেতে বসেছেন। তাদের টেবিলের পাশের দেয়ালে টিভিতে চলছে ২০১৯ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপের বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ। কিন্তু টিভিতে খেলা না দেখে ৩ জনের প্রত্যেকেই নিজেদের স্মার্টফোনে খেলার স্কোর দেখছেন।

কেস স্টাডি-তিন :

একটি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান। ওই প্রতিষ্ঠানের একটি অংশের জন্যে নির্দিষ্ট অফিস রুমে প্রায় ৮ জনের বসার ব্যবস্থা। ঘণ্টা দুয়েক সেখানে অবস্থান করে বোঝা গেল, ওই কক্ষের ৫/৬ জন সহকর্মী নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করছেন ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপসহ এ ধরনের অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে। জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হওয়া গেলো, এটি তাদের ওইদিনের বিশেষ আচরণ নয়, প্রতিদিনের চর্চা।

কেস স্টাডি-চার, পাঁচ, ছয়... :

একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এমনকি সবাই ঘরে থাকা অবস্থাতেও কতোটা যোগাযোগ হয়? এক ঘর থেকে অন্য ঘরের সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগ হয় ফেসবুকে, নয়তো হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, মেসেঞ্জার ইত্যাদির মাধ্যমে। ঘরের বাইরে থাকলে সামাজিক মাধ্যমসহ এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে যোগাযোগের চর্চা রীতিমতো প্রবণতা হয়ে উঠেছে; ঘরে ফিরেও প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া নিজেদের মধ্যে সরাসরি কথা বলার চর্চা শূন্য হয়ে যাচ্ছে। এভাবে দৈহিক বা শারীরিক কিংবা ভৌগোলিক দূরত্ব তেমন না থাকলেও মানসিক দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছে। অন্য ব্যক্তিটি যে নিজের খুব কাছাকাছিই অবস্থান করছে এবং তার সঙ্গে মুখোমুখি বসেই কথা বলা সম্ভব - মানুষের ভাবনার জগত থেকে এটি হারিয়ে যাচ্ছে।

সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে কোনো বাধা নেই; হাজারো মাইল দূরে থাকা বন্ধুর সঙ্গে সবসময় এবং সহজেই যোগাযোগের জন্যে এর চেয়ে ভালো উপায় আর হতে পারে না। সামাজিক নানা ইস্যুতে জনকল্যাণে জনমত গড়ে তোলার জন্যেও এটি সবচেয়ে সহজ প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু গাঁ ঘেঁষে বসার পরও একজন অন্যজনের মুখের দিকে না তাকিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেসবুকে সময় কাটিয়ে দেয়া বা এ ধরনের অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ চালিয়ে যাওয়া - এটি কী করে সামাজিকতার উদাহরণ হয়?

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের মাধ্যমে সমাজে বসবাসরত মানুষের মধ্যে সহজে যোগাযোগ রক্ষার কাজে বেশ সুবিধা হয়েছে। কিন্তু এর উদ্দেশ্য কখনোই মুখোমুখি যোগাযোগকে বাতিল ঘোষণা করা নয়। যোগাযোগ শাস্ত্র সম্বন্ধে যাদের পড়াশোনা আছে, তারা জানেন, ফেস-টু-ফেস যোগাযোগ বা সামনাসামনি বসে কথা বলা যোগাযোগের সবচেয়ে আদর্শ ধরন। বিভিন্ন গবেষণা বলে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে মানুষ সবসময় সত্য কথা বলে না, নিজের ভালো-মন্দ সব দিক তুলে ধরে না; সেখানে মানুষ বেশ সিলেকটিভ। ফলে কেবল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমনির্ভর যোগাযোগ আসলে প্রতিটি মানুষকে এক অর্থে অন্যদের ব্যাপারে প্রতারিত করছে। একজন মানুষের ২০০ জন বা ৫০০ জন বা কয়েক হাজার ‘বন্ধু’ হতে পারে না। ‘ফলোয়ার’ মাত্রই ‘ফ্যান’ - এর নিশ্চয়তা কী?

কোনো মানুষ দেখতে তার প্রতিষ্ঠানের আইডি বা এনআইডি কার্ডের ছবির মতো কুৎসিত নয় এবং তার ফেসবুক আইডির প্রোফাইল পিকচার বা ডিসপ্লে ফটোর মতো চমৎকারও নয়; প্রতিটি ব্যক্তি, সব দিক থেকে, আসলে ওই দুই ছবির মধ্যবর্তী সত্ত্বা। আর সেই সত্ত্বার সন্ধান কেবল সামাজিক পরিম-লে সনাতনী যোগাযোগের মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জনকল্যাণে অকল্পনীয় ভূমিকা রেখেছে - এমন উদাহরণ বিশ্বজুড়ে অগুণতি রয়েছে। তাই এসব মাধ্যমকে খারাপ বলার বা দোষারোপের সুযোগ নেই। দেখা দরকার, মানুষ এদেরকে কীভাবে বা কী কাজে ব্যবহার করছে। নিশ্চয়ই এসব মাধ্যম যোগাযোগকে সহজ ও সুবিধাজনক করার মাধ্যমে আমাদের জীবনযাত্রাকে সহজতর করেছে; কিন্তু মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ও নির্বিচারে সোশ্যাল মিডিয়ানির্ভর হতে পারে না। ভৌগোলিক দূরত্ব বা অনিবার্য কারণে সশরীরে অনুপস্থিত ‘বন্ধু’র সাথে যোগাযোগের জন্যে সামাজিক মাধ্যম অপরিহার্য হতে পারে; কিন্তু কেবল এমন সহজলভ্য মাধ্যম আছে বলে ‘বন্ধু’র সশরীর উপস্থিতিকে অপ্রয়োজনীয় করে তোলা সামাজিক বা যোগাযোগ - কোনোটিই নয়।

আর ফেসবুকের মতো সামাজিক মাধ্যমগুলো যে ব্যবহারকারীদের প্রচ-ভাবে আত্মকেন্দ্রিক ও আত্মপ্রেমী (নার্সিসিস্ট) করে তুলছে, সেদিকেও সতর্ক থাকা দরকার। নিজের একটি পোস্টে লাইক না পড়লে বা শেয়ার না হলে ব্যক্তির মনের শান্তি নষ্ট হয়; তাই বলে-কয়ে এমনকি হুমকি-ধমকি দিয়েও অনেককে লাইক ও শেয়ার আদায় করে নিতে দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ‘বন্ধু’র মন রক্ষার্থে বা পরে নিজেও লাইক ও শেয়ার পাওয়ার আশায় মানুষ অনেক সময় ভালো করে না পড়ে বা না দেখেই পরিচিত জনদের পোস্টে লাইক বা শেয়ার দিয়ে দেয়; এর ঝুঁকি কতোখানি, সেটি ভেবে দেখা দরকার নয় কি? ঘরের ভেতরের পাশের কক্ষের মানুষটিও ‘বন্ধু’, আবার হাজার মাইল দূরের একেবারে না চেনা, না জানা ব্যক্তিটিও যখন অনলাইনে ‘বন্ধু’ হয়, তার ইতিবাচক উপযোগের পাশাপাশি ক্ষতির ঝুঁকিও যে সমানভাবে অসীম, তা কি সবসময় ভেবে দেখা হয়?

আমার চেনা-জানা বা কাছের মানুষদের কেউ কেউ প্রায়ই আমাকে ফেসবুকে আইডি খুলতে বলেন। আমার উত্তর হলো, আমি কখনো ফেসবুক ব্যবহার করার প্রয়োজন অনুভব করিনি। যাদের সাথে আমার সত্যিই যোগাযোগ রক্ষার দরকার, তাদের সাথে ফোনে বা সরাসরি আমার যোগাযোগ রয়েছে; অনেকের সঙ্গে বাসায় বা অফিসে বা অন্য কোথাও প্রায়ই সরাসরি দেখা-সাক্ষাত হচ্ছে। তাহলে আমাকে কেন তাদের সঙ্গে ফেসবুকে যোগাযোগ করতে হবে? এই উত্তরে কেউ আবার বলেন, ফেসবুকে থাকলে আমার আরো অনেকের সাথে পরিচয় হতো, ‘বন্ধুত্ব’ হতো। কিন্তু আমার কথা হলো, যদি তারা আমার জীবনে দরকারি হতো কিংবা আমি যদি তাদের জীবনে দরকারি হতাম, তাহলে ফেসবুক ছাড়াই অন্য যে-কোনো উপায়ে হলেও তাদের সাথে আমার পরিচয় বা বন্ধুত্ব হতো কিংবা হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, ফেসবুক বা এ ধরনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সঠিক বা কার্যকর ব্যবহার সম্বন্ধে আমার জ্ঞান বা ব্যবহারের আগ্রহ এখনো শুন্যের পর্যায়ে আছে; যদি কখনো এ বিষয়ে আমার জ্ঞানলাভ হয় বা এই মাধ্যম ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা বোধ করি, তাহলে হয়তো ব্যবহার করবো।

শেষ কথা হলো, সামাজিক যোগাযোগের ওপর অপ্রয়োজনীয় ও অতি-নির্ভরতা মানুষের সামাজিক ও মানবিক গুণাবলিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, সামাজিক মূলধন (সোশ্যাল ক্যাপিটাল) অপচয় করে। সামাজিক মাধ্যমে যোগাযোগ দরকার নাকি যোগাযোগ দরকার, আগে তা ভেবে নেয়া দরকার। যেখানে অপরিহার্য, সেখানে ব্যবহার করতে দোষ নেই; কিন্তু যেখানে সামনাসামনি যোগাযোগের প্রয়োজন ও সুযোগ - দুটোই রয়েছে, সেখানেও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের প্রবণতা ভালো কথা নয়।

তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নির্বিচার ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেকে বরং ‘অ-সামাজিক’ করে তোলা হচ্ছে কি না, সেটি বিবেচনায় রাখা দরকার। আর ‘বন্ধু’ নির্বাচন এবং যোগাযোগের নানা ক্ষেত্রে আরো বেশি সিলেকটিভ হওয়া দরকার। বিবেচনাহীন ব্যবহারের ফলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যদি মানুষের জীবনের ‘কোয়ালিটি টাইম’ নষ্ট করে, মানুষের মধ্যে মানসিক দূরত্ব বাড়ায়, তবে প্রযুক্তির এই উৎকর্ষের যুগে এর চেয়ে দুর্ভাগ্যের কথা আর কী হতে পারে!

তাই, সামাজিক মাধ্যম - যে মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, নাকি অ-সামাজিক মাধ্যম - যা মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করবে - আমাদেরকেই ঠিক করে নিতে হবে আমরা কী চাই।

 

সজীব সরকার, 
সহকারি অধ্যাপক; জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ;
স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। লেখক ও গবেষক।


2020 All Rights Reserved | www.newsroombd.com.bd
+8801554927951 info@newsroom.com.bd