কলাম

পরীক্ষায় ভালো করতে না পারলে কিছুই যায়-আসে না


সজীব সরকার
বুধবার, ২৪ জুলাই ২০১৯ ইং ১৭:১৩
NewsRoom


এসএসসি বা এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর ভালো করতে না পারায় শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর গণমাধ্যমে বেরোয়। প্রতিবছর। এইচএসসির ফল প্রকাশের পর এবারো বেরিয়েছে। যে বয়সে তারা জীবনকে ঠিকভাবে বুঝে ওঠার মতো পরিণতই হয় না, সেই বয়সে শিক্ষার্থীরা আত্মহত্যার মাধ্যমে জীবনের ইতি টানে। তারা মনে করে, জীবনের আর কোনো অর্থ নেই, মূল্য নেই। এই মৃত্যুর দায় ওইসব শিক্ষার্থীর নয় - আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার, শিক্ষকদের এবং অভিভাবকদের।

পরীক্ষানির্ভর মূল্যায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মেধা, দক্ষতা বা যোগ্যতা যাচাই করা যায় না। এটি অত্যন্ত অবৈজ্ঞানিক। অনেক দেশ - যারা শিক্ষার মান নিয়ে ভাবে, তারা পরীক্ষানির্ভর মূল্যায়নের এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসেছে, আসছে। আমরা জাপান থেকে শিক্ষা নেইনি, সিঙ্গাপুর থেকে শিক্ষা নেইনি।

অভিভাবকরা সন্তানদের ওপর অযৌক্তিক, ভ্রান্ত ও সীমাহীন প্রত্যাশার বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছেন। এই চাপ শুরু হয় একেবারে প্লে বা নার্সারি ক্লাস থেকে। অভিভাবকরা সন্তানদের কাছে যতোটা প্রত্যাশা করেন, তারা নিজেরা পরীক্ষায় কেমন করতেন, যদি প্রশ্ন করি?

পরিবারের চাপ, শিক্ষকদের চাপ, সমাজের চাপ এবং পরীক্ষায় ভালো নম্বর না পেলে চাকরি হবে না - এইসব কারণে শিক্ষার্থীরা সবসময় আতঙ্কে ভোগে। আমি নিজে যেহেতু একজন শিক্ষক, তাই শিক্ষার্থীদের মন বুঝবার চেষ্টা করি আর চেষ্টা করি বলেই জেনে-বুঝেই বলছি, শিক্ষার্থীরা সবসময় এই প্রত্যাশার চাপের কারণে আতঙ্কে ভোগে এবং এভাবে তাদের শৈশব-কৈশোর তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হচ্ছে। এটি রীতিমতো অন্যায়, অপরাধ।

যে পদ্ধতিতে আমাদের দেশে সিলেবাস প্রণয়ন, পাঠদান এবং পরীক্ষা ও এর মূল্যায়ন হয়, তাতে সুশিক্ষিত মানুষ গড়ে তোলার উপাদান নেই। এর মধ্যেও যারা সত্যিই কিছু জেনে-বুঝে পাস করে বেরোয়, তা মূলত তাদের নিজেদের আগ্রহ এবং ঐকান্তিক চেষ্টার ফলে। আমাদের উচিত হবে, কেবল পরীক্ষানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা বা মেধা ও যোগ্যতা নির্ণয়ের প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষার্থীবান্ধব একটি ব্যবস্থা প্রণয়ন করা যেখানে শিক্ষার্থীদের কেবল মুখস্থবিদ্যা নয় বরং তাদের সৃজনশীলতা যাচাই এবং বাড়ানোর চেষ্টা থাকবে এবং শিক্ষার্থীদের সৎ, দক্ষ ও যোগ্য মানুষ হিসেবে তৈরির চেষ্টা থাকবে।

কোনো কারণে পরীক্ষার ফল আশানুরূপ না-ও হতে পারে এবং পরীক্ষার ফলই একজন শিক্ষার্থীকে যাচাইয়ের শেষ কথা নয় - এই ভরসাটুকু শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। এজন্যে সমাজকে সার্টিফিকেটসর্বস্ব মূল্যায়নের প্রবণতা ত্যাগ করতে হবে এবং সর্বোপরি অভিভাবকদের মধ্যে এই বোধ জাগ্রত হওয়া দরকার যে, কেবল সার্টিফিকেটের দ্বারা কারো জীবন বা ভাগ্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় না। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, আইনস্টাইন - কেউই ক্লাসরুমে তৈরি হয়নি, তাদের কখনো নম্বরপত্র দিয়ে মূল্যায়ন করা হয়নি।

সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে পাস করার জন্যে চাপ দেয়ার পরিবর্তে সন্তানের মধ্যে যদি জীবন ও জগতকে জানা ও বোঝার আগ্রহ জাগানো যায় এবং সন্তানের মধ্যে নৈতিকতার চর্চা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে সেই সন্তান নিজে যেমন উপকৃত হবে, তেমনি গোটা জাতি উপকৃত হবে।


সজীব সরকার,
শিক্ষক, জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ, সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি।
sajeeb_an@yahoo.com
 

আপনার মতামত লিখুন :

ডেটায় দেশ

কলাম

পরীক্ষায় ভালো করতে না পারলে কিছুই যায়-আসে না


সজীব সরকার
বুধবার, ২৪ জুলাই ২০১৯ ইং ১৭:১৩
NewsRoom


এসএসসি বা এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর ভালো করতে না পারায় শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর গণমাধ্যমে বেরোয়। প্রতিবছর। এইচএসসির ফল প্রকাশের পর এবারো বেরিয়েছে। যে বয়সে তারা জীবনকে ঠিকভাবে বুঝে ওঠার মতো পরিণতই হয় না, সেই বয়সে শিক্ষার্থীরা আত্মহত্যার মাধ্যমে জীবনের ইতি টানে। তারা মনে করে, জীবনের আর কোনো অর্থ নেই, মূল্য নেই। এই মৃত্যুর দায় ওইসব শিক্ষার্থীর নয় - আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার, শিক্ষকদের এবং অভিভাবকদের।

পরীক্ষানির্ভর মূল্যায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মেধা, দক্ষতা বা যোগ্যতা যাচাই করা যায় না। এটি অত্যন্ত অবৈজ্ঞানিক। অনেক দেশ - যারা শিক্ষার মান নিয়ে ভাবে, তারা পরীক্ষানির্ভর মূল্যায়নের এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসেছে, আসছে। আমরা জাপান থেকে শিক্ষা নেইনি, সিঙ্গাপুর থেকে শিক্ষা নেইনি।

অভিভাবকরা সন্তানদের ওপর অযৌক্তিক, ভ্রান্ত ও সীমাহীন প্রত্যাশার বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছেন। এই চাপ শুরু হয় একেবারে প্লে বা নার্সারি ক্লাস থেকে। অভিভাবকরা সন্তানদের কাছে যতোটা প্রত্যাশা করেন, তারা নিজেরা পরীক্ষায় কেমন করতেন, যদি প্রশ্ন করি?

পরিবারের চাপ, শিক্ষকদের চাপ, সমাজের চাপ এবং পরীক্ষায় ভালো নম্বর না পেলে চাকরি হবে না - এইসব কারণে শিক্ষার্থীরা সবসময় আতঙ্কে ভোগে। আমি নিজে যেহেতু একজন শিক্ষক, তাই শিক্ষার্থীদের মন বুঝবার চেষ্টা করি আর চেষ্টা করি বলেই জেনে-বুঝেই বলছি, শিক্ষার্থীরা সবসময় এই প্রত্যাশার চাপের কারণে আতঙ্কে ভোগে এবং এভাবে তাদের শৈশব-কৈশোর তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হচ্ছে। এটি রীতিমতো অন্যায়, অপরাধ।

যে পদ্ধতিতে আমাদের দেশে সিলেবাস প্রণয়ন, পাঠদান এবং পরীক্ষা ও এর মূল্যায়ন হয়, তাতে সুশিক্ষিত মানুষ গড়ে তোলার উপাদান নেই। এর মধ্যেও যারা সত্যিই কিছু জেনে-বুঝে পাস করে বেরোয়, তা মূলত তাদের নিজেদের আগ্রহ এবং ঐকান্তিক চেষ্টার ফলে। আমাদের উচিত হবে, কেবল পরীক্ষানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা বা মেধা ও যোগ্যতা নির্ণয়ের প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষার্থীবান্ধব একটি ব্যবস্থা প্রণয়ন করা যেখানে শিক্ষার্থীদের কেবল মুখস্থবিদ্যা নয় বরং তাদের সৃজনশীলতা যাচাই এবং বাড়ানোর চেষ্টা থাকবে এবং শিক্ষার্থীদের সৎ, দক্ষ ও যোগ্য মানুষ হিসেবে তৈরির চেষ্টা থাকবে।

কোনো কারণে পরীক্ষার ফল আশানুরূপ না-ও হতে পারে এবং পরীক্ষার ফলই একজন শিক্ষার্থীকে যাচাইয়ের শেষ কথা নয় - এই ভরসাটুকু শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। এজন্যে সমাজকে সার্টিফিকেটসর্বস্ব মূল্যায়নের প্রবণতা ত্যাগ করতে হবে এবং সর্বোপরি অভিভাবকদের মধ্যে এই বোধ জাগ্রত হওয়া দরকার যে, কেবল সার্টিফিকেটের দ্বারা কারো জীবন বা ভাগ্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় না। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, আইনস্টাইন - কেউই ক্লাসরুমে তৈরি হয়নি, তাদের কখনো নম্বরপত্র দিয়ে মূল্যায়ন করা হয়নি।

সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে পাস করার জন্যে চাপ দেয়ার পরিবর্তে সন্তানের মধ্যে যদি জীবন ও জগতকে জানা ও বোঝার আগ্রহ জাগানো যায় এবং সন্তানের মধ্যে নৈতিকতার চর্চা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে সেই সন্তান নিজে যেমন উপকৃত হবে, তেমনি গোটা জাতি উপকৃত হবে।


সজীব সরকার,
শিক্ষক, জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ, সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি।
sajeeb_an@yahoo.com
 

আপনার মতামত লিখুন :


পরীক্ষায় ভালো করতে না পারলে কিছুই যায়-আসে না

সজীব সরকার বুধবার, ২৪ জুলাই ২০১৯ ইং ১৭:১৩ NewsRoom


এসএসসি বা এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর ভালো করতে না পারায় শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর গণমাধ্যমে বেরোয়। প্রতিবছর। এইচএসসির ফল প্রকাশের পর এবারো বেরিয়েছে। যে বয়সে তারা জীবনকে ঠিকভাবে বুঝে ওঠার মতো পরিণতই হয় না, সেই বয়সে শিক্ষার্থীরা আত্মহত্যার মাধ্যমে জীবনের ইতি টানে। তারা মনে করে, জীবনের আর কোনো অর্থ নেই, মূল্য নেই। এই মৃত্যুর দায় ওইসব শিক্ষার্থীর নয় - আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার, শিক্ষকদের এবং অভিভাবকদের।

পরীক্ষানির্ভর মূল্যায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মেধা, দক্ষতা বা যোগ্যতা যাচাই করা যায় না। এটি অত্যন্ত অবৈজ্ঞানিক। অনেক দেশ - যারা শিক্ষার মান নিয়ে ভাবে, তারা পরীক্ষানির্ভর মূল্যায়নের এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসেছে, আসছে। আমরা জাপান থেকে শিক্ষা নেইনি, সিঙ্গাপুর থেকে শিক্ষা নেইনি।

অভিভাবকরা সন্তানদের ওপর অযৌক্তিক, ভ্রান্ত ও সীমাহীন প্রত্যাশার বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছেন। এই চাপ শুরু হয় একেবারে প্লে বা নার্সারি ক্লাস থেকে। অভিভাবকরা সন্তানদের কাছে যতোটা প্রত্যাশা করেন, তারা নিজেরা পরীক্ষায় কেমন করতেন, যদি প্রশ্ন করি?

পরিবারের চাপ, শিক্ষকদের চাপ, সমাজের চাপ এবং পরীক্ষায় ভালো নম্বর না পেলে চাকরি হবে না - এইসব কারণে শিক্ষার্থীরা সবসময় আতঙ্কে ভোগে। আমি নিজে যেহেতু একজন শিক্ষক, তাই শিক্ষার্থীদের মন বুঝবার চেষ্টা করি আর চেষ্টা করি বলেই জেনে-বুঝেই বলছি, শিক্ষার্থীরা সবসময় এই প্রত্যাশার চাপের কারণে আতঙ্কে ভোগে এবং এভাবে তাদের শৈশব-কৈশোর তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হচ্ছে। এটি রীতিমতো অন্যায়, অপরাধ।

যে পদ্ধতিতে আমাদের দেশে সিলেবাস প্রণয়ন, পাঠদান এবং পরীক্ষা ও এর মূল্যায়ন হয়, তাতে সুশিক্ষিত মানুষ গড়ে তোলার উপাদান নেই। এর মধ্যেও যারা সত্যিই কিছু জেনে-বুঝে পাস করে বেরোয়, তা মূলত তাদের নিজেদের আগ্রহ এবং ঐকান্তিক চেষ্টার ফলে। আমাদের উচিত হবে, কেবল পরীক্ষানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা বা মেধা ও যোগ্যতা নির্ণয়ের প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষার্থীবান্ধব একটি ব্যবস্থা প্রণয়ন করা যেখানে শিক্ষার্থীদের কেবল মুখস্থবিদ্যা নয় বরং তাদের সৃজনশীলতা যাচাই এবং বাড়ানোর চেষ্টা থাকবে এবং শিক্ষার্থীদের সৎ, দক্ষ ও যোগ্য মানুষ হিসেবে তৈরির চেষ্টা থাকবে।

কোনো কারণে পরীক্ষার ফল আশানুরূপ না-ও হতে পারে এবং পরীক্ষার ফলই একজন শিক্ষার্থীকে যাচাইয়ের শেষ কথা নয় - এই ভরসাটুকু শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। এজন্যে সমাজকে সার্টিফিকেটসর্বস্ব মূল্যায়নের প্রবণতা ত্যাগ করতে হবে এবং সর্বোপরি অভিভাবকদের মধ্যে এই বোধ জাগ্রত হওয়া দরকার যে, কেবল সার্টিফিকেটের দ্বারা কারো জীবন বা ভাগ্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় না। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, আইনস্টাইন - কেউই ক্লাসরুমে তৈরি হয়নি, তাদের কখনো নম্বরপত্র দিয়ে মূল্যায়ন করা হয়নি।

সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে পাস করার জন্যে চাপ দেয়ার পরিবর্তে সন্তানের মধ্যে যদি জীবন ও জগতকে জানা ও বোঝার আগ্রহ জাগানো যায় এবং সন্তানের মধ্যে নৈতিকতার চর্চা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে সেই সন্তান নিজে যেমন উপকৃত হবে, তেমনি গোটা জাতি উপকৃত হবে।


সজীব সরকার,
শিক্ষক, জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ, সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি।
sajeeb_an@yahoo.com
 


2020 All Rights Reserved | www.newsroombd.com.bd
+8801554927951 info@newsroom.com.bd