কলাম
আবরার হত্যা: অভিযুক্তদের বাবা-মায়েরা কেন সন্তানের পক্ষে?
সম্প্রতি আবরার হত্যার বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের বাবা-মায়েদের দৃষ্টিভঙ্গি দেখে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বা হতাশ হয়েছেন। বিক্ষিপ্তভাবে তারা সবাই এটা বলার চেষ্টা করেছেন যে- তাদের সন্তান নিরপরাধ, তাদের দিয়ে এটা করানো হয়েছে। ন্যায় বিচারের মাধ্যমে তারা সন্তানের মুক্তি চান। (কিছু ব্যতিক্রম রেখে বলছি।)
এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে, তারা অভিযুক্ত (অপরাধী)। কারণ ভিডিও ফুটেজ তাই বলছে। তবে, বিচার প্রক্রিয়া চলাকালীন তাদের অপরাধী না বলে অভিযুক্তই বলবো। কিন্তু কথা হচ্ছে তাদের এই প্রবণতার কারণ কি?
আচ্ছা, অভিযুক্তদের বাবা-মায়েরা কি জানেন না, ছেলে হারানোর ব্যথা কেমন? তাহলে সন্তান হারানো আবরারের বাবা-মায়ের সেই ব্যথা কি অভিযুক্তদের বাবা-মায়েদের সন্তানের প্রতি মমতার চেয়ে কম?
শুধু তাই নয়, সম্প্রতি আরো একটা বিষয় মনের মধ্যে দাগ কেটে গেছে। তা হলো-
চাঁদাবাজি, ক্যাসিনো ব্যবসাসহ নানাবিদ অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে আটক যুবলীগ নেতা ইসমাল হোসেন সম্রাট। মোটামুটি এবিষয়ে সকলেই জানে যে সম্রাট আসলে কি।
কারণ, বিস্তর তদন্ত আর গোঁয়েন্দা রিপোর্ট প্রধানমন্ত্রীর হাতে যাওয়ার পরেই সম্রাটকে আটক করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। তা সত্ত্বেও সম্রাটের মা সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করলেন- তার ছেলে নির্দোষ। যেমনটা দাবি করছেন আবরার হত্যায় অভিযুক্তদের বাবা-মায়েরা।
বাবা-মায়েদের সন্তানের প্রতি ভালোবাসা কি নীতি-নৈতিকতার, অপরাধবোধের উর্ধ্বে? বিষয়গুলো মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিলো। কোন উত্তর পাচ্ছিলাম না।
অবশেষে ‘‘পারসোনালিটি অ্যান্ড সোশ্যাল সাইকোলজি’’ বুলেটিনে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকদের একটা গবেষণালব্ধ ফলাফল দেখে নিজেকে শান্ত্বনা দিলাম। খুঁজে পেলাম সম্ভাব্য উত্তর। গবেষকদল ৩ হাজার অংশগ্রহণকারীদের উপর এক জরিপ চালালেন। জানার চেষ্টা করলেন যে, কাছের মানুষ অপরাধ করলে তাদের প্রতিক্রিয়া ও পদক্ষেপ কেমন হয়?
ফলাফলে দেখা যায়, ব্যক্তি অপরিচিত বা দূরের কেউ হলে তারা পুলিশের কাছে সত্যি কথা বলবে। কিন্তু ঘনিষ্ঠ কেউ হলে তাকে বাঁচানোর জন্য মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে থাকে।
এর সাথে অপরাধের মাত্রাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অপরাধ সামান্য হলে অংশগ্রহণকারীরা সত্যি কথা বলে। কারণ, তারা জানে অপরাধীকে খুব বড় শাস্তি পেতে হবে না। কিন্তু অপরাধের মাত্রা যত বাড়তে থাকে, অর্থাৎ সম্ভাব্য শাস্তির পরিমাণ বাড়বে, তখন তাদের মিথ্যা বলার প্রবণতাও বেড়ে যায়।
অথচ একই অপরাধ অপরিচিত বা দূরের কেউ করলে তারা তখন সত্যি কথাই বলবে। কারণ, তারা মনে করে এতে সমাজের উপকার হবে। অথচ কাছের মানুষের ক্ষেত্রে তারা বিপরীত কাজ করে। তারা মনে করে, কাছের মানুষটি সময়ের সাথে পরিবর্তন হবে, তাই তাদেরকে আরেকটি সুযোগ দেয়া উচিৎ।
কিন্তু কাছের মানুষটির কাজও যে নৈতিকতার লঙ্ঘন এবং নিন্দনীয় কাজ, সেটি কি তারা মানে? হ্যাঁ, সেটি তারা মানে। তারা অবশ্যই বিশ্বাস করে যে অপরাধটি কাছের বা দূরের যেই করুক সেটা অন্যায়।
কিন্তু তারপরেও কেন তারা দূরের মানুষটিকে আইনের আওতায় আনতে সাহায্য করলেও, কাছের মানুষটির ক্ষেত্রে তা করবে না? কারণ, তারা নিজেরাই কাছের মানুষটির মুখোমুখি হতে চায়, তাকে শাস্তি দিতে চায় এবং তাকে পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই করতে চায়। কিন্তু আইনের হাতে তাকে তুলে দিতে চায় না কিংবা অন্য কেউ তার বিচার করুক তা চায় না।
এখন এই গবেষণার সাথে আবরার হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের বাবা-মায়ের অবস্থান হুবুহু মিলে যায়। তাদের অপরাধ যেহেতু বড়, তাই বড় শাস্তি থেকে সন্তানদের বাঁচাতেই মিথ্যা বা এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল গ্রহণ করেছে। এখন প্রশ্ন হলো তারা কি মনে করে না যে, এটা নিন্দনীয় কাজ, নৈতিকতার লঙ্ঘন?
হ্যাঁ তারা সেটা মনে করে কিন্তু মুখে প্রকাশ করে না। তারা নিজেরাই সন্তানের মুখোমুখি হতে চায়, নিজেরাই শাস্তি দিতে চায়। তাদের পরিবর্তনের জন্য তারা প্রয়োজনীয় সবকিছুই করতে চায়। কিন্তু সেটা অন্যের সামনে নয়, লোক চক্ষুর অন্তরালে।
কাজটি যে কখনোই সহজ নয়, সে কথা অনস্বীকার্য। দূরের কেউ বিপদে পড়লে সেটিকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা যেতে পারে। কিন্তু কাছের মানুষ বিপদে পড়লে, কিংবা বিপদে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হলে, তখনো নিজের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা সহজ কাজ নয়।
সেরকম প্রবল মানসিক শক্তিও খুব কম মানুষেরই রয়েছে। তারপরেও আমাদের চেষ্টা করা উচিৎ যে, অন্যায়কারী যত কাছের মানুষই হোক না কেন, তা যেন আমাদের বিচারবোধকে প্রভাবিত করতে না পারে।
শফিকুল ইসলাম শান্ত নিউজ ব্রডকাস্টার অ্যান্ড প্রেজেন্টার; রেডিও ধ্বনি ৯১.২ এফ.এম.
কলাম
আবরার হত্যা: অভিযুক্তদের বাবা-মায়েরা কেন সন্তানের পক্ষে?
সম্প্রতি আবরার হত্যার বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের বাবা-মায়েদের দৃষ্টিভঙ্গি দেখে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বা হতাশ হয়েছেন। বিক্ষিপ্তভাবে তারা সবাই এটা বলার চেষ্টা করেছেন যে- তাদের সন্তান নিরপরাধ, তাদের দিয়ে এটা করানো হয়েছে। ন্যায় বিচারের মাধ্যমে তারা সন্তানের মুক্তি চান। (কিছু ব্যতিক্রম রেখে বলছি।)
এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে, তারা অভিযুক্ত (অপরাধী)। কারণ ভিডিও ফুটেজ তাই বলছে। তবে, বিচার প্রক্রিয়া চলাকালীন তাদের অপরাধী না বলে অভিযুক্তই বলবো। কিন্তু কথা হচ্ছে তাদের এই প্রবণতার কারণ কি?
আচ্ছা, অভিযুক্তদের বাবা-মায়েরা কি জানেন না, ছেলে হারানোর ব্যথা কেমন? তাহলে সন্তান হারানো আবরারের বাবা-মায়ের সেই ব্যথা কি অভিযুক্তদের বাবা-মায়েদের সন্তানের প্রতি মমতার চেয়ে কম?
শুধু তাই নয়, সম্প্রতি আরো একটা বিষয় মনের মধ্যে দাগ কেটে গেছে। তা হলো-
চাঁদাবাজি, ক্যাসিনো ব্যবসাসহ নানাবিদ অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে আটক যুবলীগ নেতা ইসমাল হোসেন সম্রাট। মোটামুটি এবিষয়ে সকলেই জানে যে সম্রাট আসলে কি।
কারণ, বিস্তর তদন্ত আর গোঁয়েন্দা রিপোর্ট প্রধানমন্ত্রীর হাতে যাওয়ার পরেই সম্রাটকে আটক করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। তা সত্ত্বেও সম্রাটের মা সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করলেন- তার ছেলে নির্দোষ। যেমনটা দাবি করছেন আবরার হত্যায় অভিযুক্তদের বাবা-মায়েরা।
বাবা-মায়েদের সন্তানের প্রতি ভালোবাসা কি নীতি-নৈতিকতার, অপরাধবোধের উর্ধ্বে? বিষয়গুলো মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিলো। কোন উত্তর পাচ্ছিলাম না।
অবশেষে ‘‘পারসোনালিটি অ্যান্ড সোশ্যাল সাইকোলজি’’ বুলেটিনে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকদের একটা গবেষণালব্ধ ফলাফল দেখে নিজেকে শান্ত্বনা দিলাম। খুঁজে পেলাম সম্ভাব্য উত্তর। গবেষকদল ৩ হাজার অংশগ্রহণকারীদের উপর এক জরিপ চালালেন। জানার চেষ্টা করলেন যে, কাছের মানুষ অপরাধ করলে তাদের প্রতিক্রিয়া ও পদক্ষেপ কেমন হয়?
ফলাফলে দেখা যায়, ব্যক্তি অপরিচিত বা দূরের কেউ হলে তারা পুলিশের কাছে সত্যি কথা বলবে। কিন্তু ঘনিষ্ঠ কেউ হলে তাকে বাঁচানোর জন্য মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে থাকে।
এর সাথে অপরাধের মাত্রাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অপরাধ সামান্য হলে অংশগ্রহণকারীরা সত্যি কথা বলে। কারণ, তারা জানে অপরাধীকে খুব বড় শাস্তি পেতে হবে না। কিন্তু অপরাধের মাত্রা যত বাড়তে থাকে, অর্থাৎ সম্ভাব্য শাস্তির পরিমাণ বাড়বে, তখন তাদের মিথ্যা বলার প্রবণতাও বেড়ে যায়।
অথচ একই অপরাধ অপরিচিত বা দূরের কেউ করলে তারা তখন সত্যি কথাই বলবে। কারণ, তারা মনে করে এতে সমাজের উপকার হবে। অথচ কাছের মানুষের ক্ষেত্রে তারা বিপরীত কাজ করে। তারা মনে করে, কাছের মানুষটি সময়ের সাথে পরিবর্তন হবে, তাই তাদেরকে আরেকটি সুযোগ দেয়া উচিৎ।
কিন্তু কাছের মানুষটির কাজও যে নৈতিকতার লঙ্ঘন এবং নিন্দনীয় কাজ, সেটি কি তারা মানে? হ্যাঁ, সেটি তারা মানে। তারা অবশ্যই বিশ্বাস করে যে অপরাধটি কাছের বা দূরের যেই করুক সেটা অন্যায়।
কিন্তু তারপরেও কেন তারা দূরের মানুষটিকে আইনের আওতায় আনতে সাহায্য করলেও, কাছের মানুষটির ক্ষেত্রে তা করবে না? কারণ, তারা নিজেরাই কাছের মানুষটির মুখোমুখি হতে চায়, তাকে শাস্তি দিতে চায় এবং তাকে পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই করতে চায়। কিন্তু আইনের হাতে তাকে তুলে দিতে চায় না কিংবা অন্য কেউ তার বিচার করুক তা চায় না।
এখন এই গবেষণার সাথে আবরার হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের বাবা-মায়ের অবস্থান হুবুহু মিলে যায়। তাদের অপরাধ যেহেতু বড়, তাই বড় শাস্তি থেকে সন্তানদের বাঁচাতেই মিথ্যা বা এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল গ্রহণ করেছে। এখন প্রশ্ন হলো তারা কি মনে করে না যে, এটা নিন্দনীয় কাজ, নৈতিকতার লঙ্ঘন?
হ্যাঁ তারা সেটা মনে করে কিন্তু মুখে প্রকাশ করে না। তারা নিজেরাই সন্তানের মুখোমুখি হতে চায়, নিজেরাই শাস্তি দিতে চায়। তাদের পরিবর্তনের জন্য তারা প্রয়োজনীয় সবকিছুই করতে চায়। কিন্তু সেটা অন্যের সামনে নয়, লোক চক্ষুর অন্তরালে।
কাজটি যে কখনোই সহজ নয়, সে কথা অনস্বীকার্য। দূরের কেউ বিপদে পড়লে সেটিকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা যেতে পারে। কিন্তু কাছের মানুষ বিপদে পড়লে, কিংবা বিপদে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হলে, তখনো নিজের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা সহজ কাজ নয়।
সেরকম প্রবল মানসিক শক্তিও খুব কম মানুষেরই রয়েছে। তারপরেও আমাদের চেষ্টা করা উচিৎ যে, অন্যায়কারী যত কাছের মানুষই হোক না কেন, তা যেন আমাদের বিচারবোধকে প্রভাবিত করতে না পারে।
শফিকুল ইসলাম শান্ত নিউজ ব্রডকাস্টার অ্যান্ড প্রেজেন্টার; রেডিও ধ্বনি ৯১.২ এফ.এম.
আপনার মতামত লিখুন :
আরও পড়ুন
সম্প্রতি আবরার হত্যার বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের বাবা-মায়েদের দৃষ্টিভঙ্গি দেখে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বা হতাশ হয়েছেন। বিক্ষিপ্তভাবে তারা সবাই এটা বলার চেষ্টা করেছেন যে- তাদের সন্তান নিরপরাধ, তাদের দিয়ে এটা করানো হয়েছে। ন্যায় বিচারের মাধ্যমে তারা সন্তানের মুক্তি চান। (কিছু ব্যতিক্রম রেখে বলছি।)
এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে, তারা অভিযুক্ত (অপরাধী)। কারণ ভিডিও ফুটেজ তাই বলছে। তবে, বিচার প্রক্রিয়া চলাকালীন তাদের অপরাধী না বলে অভিযুক্তই বলবো। কিন্তু কথা হচ্ছে তাদের এই প্রবণতার কারণ কি?
আচ্ছা, অভিযুক্তদের বাবা-মায়েরা কি জানেন না, ছেলে হারানোর ব্যথা কেমন? তাহলে সন্তান হারানো আবরারের বাবা-মায়ের সেই ব্যথা কি অভিযুক্তদের বাবা-মায়েদের সন্তানের প্রতি মমতার চেয়ে কম?
শুধু তাই নয়, সম্প্রতি আরো একটা বিষয় মনের মধ্যে দাগ কেটে গেছে। তা হলো-
চাঁদাবাজি, ক্যাসিনো ব্যবসাসহ নানাবিদ অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে আটক যুবলীগ নেতা ইসমাল হোসেন সম্রাট। মোটামুটি এবিষয়ে সকলেই জানে যে সম্রাট আসলে কি।
কারণ, বিস্তর তদন্ত আর গোঁয়েন্দা রিপোর্ট প্রধানমন্ত্রীর হাতে যাওয়ার পরেই সম্রাটকে আটক করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। তা সত্ত্বেও সম্রাটের মা সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করলেন- তার ছেলে নির্দোষ। যেমনটা দাবি করছেন আবরার হত্যায় অভিযুক্তদের বাবা-মায়েরা।
বাবা-মায়েদের সন্তানের প্রতি ভালোবাসা কি নীতি-নৈতিকতার, অপরাধবোধের উর্ধ্বে? বিষয়গুলো মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিলো। কোন উত্তর পাচ্ছিলাম না।
অবশেষে ‘‘পারসোনালিটি অ্যান্ড সোশ্যাল সাইকোলজি’’ বুলেটিনে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকদের একটা গবেষণালব্ধ ফলাফল দেখে নিজেকে শান্ত্বনা দিলাম। খুঁজে পেলাম সম্ভাব্য উত্তর। গবেষকদল ৩ হাজার অংশগ্রহণকারীদের উপর এক জরিপ চালালেন। জানার চেষ্টা করলেন যে, কাছের মানুষ অপরাধ করলে তাদের প্রতিক্রিয়া ও পদক্ষেপ কেমন হয়?
ফলাফলে দেখা যায়, ব্যক্তি অপরিচিত বা দূরের কেউ হলে তারা পুলিশের কাছে সত্যি কথা বলবে। কিন্তু ঘনিষ্ঠ কেউ হলে তাকে বাঁচানোর জন্য মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে থাকে।
এর সাথে অপরাধের মাত্রাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অপরাধ সামান্য হলে অংশগ্রহণকারীরা সত্যি কথা বলে। কারণ, তারা জানে অপরাধীকে খুব বড় শাস্তি পেতে হবে না। কিন্তু অপরাধের মাত্রা যত বাড়তে থাকে, অর্থাৎ সম্ভাব্য শাস্তির পরিমাণ বাড়বে, তখন তাদের মিথ্যা বলার প্রবণতাও বেড়ে যায়।
অথচ একই অপরাধ অপরিচিত বা দূরের কেউ করলে তারা তখন সত্যি কথাই বলবে। কারণ, তারা মনে করে এতে সমাজের উপকার হবে। অথচ কাছের মানুষের ক্ষেত্রে তারা বিপরীত কাজ করে। তারা মনে করে, কাছের মানুষটি সময়ের সাথে পরিবর্তন হবে, তাই তাদেরকে আরেকটি সুযোগ দেয়া উচিৎ।
কিন্তু কাছের মানুষটির কাজও যে নৈতিকতার লঙ্ঘন এবং নিন্দনীয় কাজ, সেটি কি তারা মানে? হ্যাঁ, সেটি তারা মানে। তারা অবশ্যই বিশ্বাস করে যে অপরাধটি কাছের বা দূরের যেই করুক সেটা অন্যায়।
কিন্তু তারপরেও কেন তারা দূরের মানুষটিকে আইনের আওতায় আনতে সাহায্য করলেও, কাছের মানুষটির ক্ষেত্রে তা করবে না? কারণ, তারা নিজেরাই কাছের মানুষটির মুখোমুখি হতে চায়, তাকে শাস্তি দিতে চায় এবং তাকে পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই করতে চায়। কিন্তু আইনের হাতে তাকে তুলে দিতে চায় না কিংবা অন্য কেউ তার বিচার করুক তা চায় না।
এখন এই গবেষণার সাথে আবরার হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের বাবা-মায়ের অবস্থান হুবুহু মিলে যায়। তাদের অপরাধ যেহেতু বড়, তাই বড় শাস্তি থেকে সন্তানদের বাঁচাতেই মিথ্যা বা এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল গ্রহণ করেছে। এখন প্রশ্ন হলো তারা কি মনে করে না যে, এটা নিন্দনীয় কাজ, নৈতিকতার লঙ্ঘন?
হ্যাঁ তারা সেটা মনে করে কিন্তু মুখে প্রকাশ করে না। তারা নিজেরাই সন্তানের মুখোমুখি হতে চায়, নিজেরাই শাস্তি দিতে চায়। তাদের পরিবর্তনের জন্য তারা প্রয়োজনীয় সবকিছুই করতে চায়। কিন্তু সেটা অন্যের সামনে নয়, লোক চক্ষুর অন্তরালে।
কাজটি যে কখনোই সহজ নয়, সে কথা অনস্বীকার্য। দূরের কেউ বিপদে পড়লে সেটিকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা যেতে পারে। কিন্তু কাছের মানুষ বিপদে পড়লে, কিংবা বিপদে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হলে, তখনো নিজের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা সহজ কাজ নয়।
সেরকম প্রবল মানসিক শক্তিও খুব কম মানুষেরই রয়েছে। তারপরেও আমাদের চেষ্টা করা উচিৎ যে, অন্যায়কারী যত কাছের মানুষই হোক না কেন, তা যেন আমাদের বিচারবোধকে প্রভাবিত করতে না পারে।
শফিকুল ইসলাম শান্ত নিউজ ব্রডকাস্টার অ্যান্ড প্রেজেন্টার; রেডিও ধ্বনি ৯১.২ এফ.এম.
আপনার মতামত লিখুন :